জাতীয় ক্রিকেট দলের অফস্পিনার নাঈম হাসানকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে নামিয়ে রাস্তায় বেধড়ক মারধর এবং পরবর্তীতে থানায় নিয়ে গিয়েও দ্বিতীয় দফায় হেনস্তা করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে খুলশী থানার অভিযুক্ত এসআই শফিকুল ইসলাম ভুঁইয়া ও কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সিএমপি। একই সাথে মারধরে সরাসরি জড়িত থাকা পুলিশের সোর্স সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ক্রিকেটার নাঈম হাসান জানান, ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগের (ডিপিএল) খেলা শেষ করে শুক্রবার রাতে তিনি আকাশপথে চট্টগ্রামে পৌঁছান। বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে নগরের চান্দগাঁও এলাকার বাসায় ফেরার পথে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে ডিবি (গোয়েন্দা পুলিশ) পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাদের গতিরোধ করে।
গাড়ি থামানোর পর কিছু না বলেই নাঈম হাসানকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে গলার চাপ ধরে হেনস্তা করা শুরু হয়। নাঈম নিজের ব্যাগ তল্লাশি করতে বলেন এবং নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার পরিচয় দিয়ে আইডি কার্ড প্রদর্শন করেন। কিন্তু কর্তব্যরত খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম ও সাদা পোশাকে থাকা সোর্স সোহেল তাঁর কোনো কথাই শোনেননি। উল্টো এসআই শফিকুল হাতে থাকা লাঠি দিয়ে এবং সোর্স সোহেল লোহার পাইপ দিয়ে ক্রিকেটার নাঈমকে বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন।
নাঈমের আত্মচিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে প্রায় এক থেকে দুইশত সাধারণ মানুষ ও ক্রিকেটপ্রেমী জড়ো হয়ে যান। উপস্থিত জনতা চিৎকার করে নাঈম হাসানের ক্রিকেটার পরিচয় নিশ্চিত করলেও পুলিশ সদস্যরা তা পাত্তাই দেয়নি। উল্টো তারা নাঈমকে ধমক দিয়ে বলে, "তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।" পরবর্তীতে তাকে পুলিশের গাড়িতে না তুলে একটি ভিন্ন প্রাইভেট গাড়িতে জোরপূর্বক তোলার চেষ্টা করা হলে উপস্থিত জনতার বাধায় তা ব্যর্থ হয় এবং পরে তাকে একটি অটোরিকশায় করে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
নাঈম হাসানের অভিযোগ, থানায় নিয়ে যাওয়ার পরও পুলিশের অপেশাদার আচরণ থামেনি। খুলশী থানার ওসির কক্ষের ভেতরেও তাকে নানাভাবে নাজেহাল, কিল, ঘুষি ও লাথি মারা হয়েছে। পরবর্তীতে মধ্যরাতে খবর পেয়ে নাঈমের বাবা মাহবুবুল আলমসহ স্বজন ও শত শত ক্রিকেটপ্রেমী থানায় গিয়ে জড়ো হন। নাঈমের বাবা অভিযোগ করেন, খবর পেয়ে থানায় গেলে ডিউটি অফিসার তাঁর সাথেও অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে বিসিবি কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে গভীর রাতে নাঈমকে থানা থেকে ছাড়া হয়।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জানান, এই কথিত অভিযানের বিষয়ে এসআই শফিকুল তাকে আগে থেকে কিছুই জানাননি। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছুটিতে থাকা অন্য এক এসআইয়ের দেওয়া ভুল তথ্যের ভিত্তিতে 'সোনার চোরাচালান' সন্দেহে অটোরিকশাটিতে এই অভিযান চালানো হয়েছিল। ওসি বলেন, থানায় নিয়ে আসার পর নাঈম হাসানের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তারা দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে ক্রিকেটার নাঈম হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আজকে আমার পরিচয়ের কারণে স্বজন ও ক্রিকেটপ্রেমীরা থানায় এসেছে বলে আমি ছাড়া পেয়েছি। কিন্তু সাধারণ কোনো নাগরিক হলে তার কী হতো? আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।"
এই ঘটনায় শনিবার সকালে নাঈম হাসানের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ এনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় এসআই শফিকুল, কনস্টেবল রাসেল এবং সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়েছে।
শনিবার দুপুরে ক্রিকেটার নাঈম হাসানের বাসায় গিয়ে তাঁর পরিবারের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। তিনি সাংবাদিকদের স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় পুলিশ বিভাগ নেবে না। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের আচরণ সম্পূর্ণ অপেশাদার ছিল। পুরো টিমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হবে এবং বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।" ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের ওপর পুলিশের এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং ক্রিকেটারদের কল্যাণমূলক সংগঠন কোয়াব (CWAB)। মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস এবং তাসকিন আহমেদসহ নাঈমের জাতীয় দলের সতীর্থরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দোষী পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন।


