আজ ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেদনাবিধুর এই দিনটি একসময় ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হলেও, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবার দিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবহে এসেছে। এবার নেই কোনো সরকারি ছুটি বা রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা।
ইতিহাসের সেই কালো রাত
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে ঘাতকদের হাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়াও তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল নিহত হন। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তাঁর পরিবারের সদস্য, ভাগনে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনি এবং তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিসহ আরও বেশ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে ছুটে আসা কর্নেল জামিল ও অন্যান্য কয়েক কর্মকর্তাও সেদিন প্রাণ হারান। সেসময় বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত, পরে উচ্চ আদালত ১২ জনের রায় বহাল রাখেন। এদের মধ্যে এ পর্যন্ত ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, একজন বিদেশে মারা গেছেন এবং পাঁচজন এখনো পলাতক রয়েছেন।
বদলে যাওয়া দৃশ্যপট ও বাতিল হওয়া ছুটি
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি শাসনামলে ১৫ আগস্ট দিনটিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালন করা হতো এবং এ দিনটিতে সরকারি ছুটি ছিল। মাসব্যাপী চলত নানা কর্মসূচি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এবং টুঙ্গিপাড়ায় শ্রদ্ধা নিবেদন ছিল বাধ্যতামূলক।
তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ১৫ আগস্টের সাধারণ ছুটি বাতিল করে, যা এখনো বহাল রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের দিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাসভবনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয় এবং পরবর্তীতে বাড়িটি ভেঙেও ফেলা হয়।
বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অধিকাংশ নেতাকর্মী আত্মগোপনে রয়েছেন।
দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তা
দিনটিকে ঘিরে যেকোনো ধরনের নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও গোপালগঞ্জে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও যৌথ বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া, নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে যে বিশাল পরিবর্তন এসেছে, এবারের ১৫ আগস্টের চিত্র যেন তারই এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।


